গদ্য সাহিত্য


 

আন্দামানে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালির বর্তমান প্রজন্মে স্মৃতির উপাদান
ডঃ জ্যোতির্ময় রায় চৌধুরী
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, জওহরলাল নেহরু রাজকীয় মহাবিদ্যালয়,পোর্টব্লেয়ার
jyo 63 ti @ gmail.com

দেশভাগের কিছু পরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের ক্রমবর্ধমান চাপ লাঘব করতে ভারত সরকার আন্দামানে নয়াবসতি স্হাপনে উদ্যোগী হলে কেন্দ্রীয় সরকারের শরণার্থী ও পুনর্বাসন মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তত্ত্বাবধানে ১৯৪৯ সাল থেকে আন্দামানে দফায় দফায় বাঙালি শরণার্থীদের পাঠাতে শুরু করে। ১৯৮১ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে একচল্লিশ হাজার মানুষ পুনর্বাসন পেয়েছিলেন এই দ্বীপপুঞ্জে। এঁরা ছিলেন মূলতঃ কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী মানুষ। স্বদেশে কিম্বা বিদেশে যেখানেই বাস করুক না কেন, প্রতিটি মানবগোষ্ঠী পরম্পরাসূত্রে প্রাপ্ত লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সাধ্য মত রক্ষা করার চেষ্টা করে। বিগত ষাট দশকের বেশি সময় ধরে আন্দামানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা বাঙালি উপনিবেশগুলিতেও এর ব্যতিক্রম হয় নি।

আগত ও পুনর্বাসনপ্রাপ্ত মিশ্র লোকসমাজের মধ্যে যে ঐসব অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির প্রতিটি উপাদানই যে সযত্নে সংরক্ষিত হতে পেরেছে তা’ কিন্তু নয়। কয়েকটি কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অবলুপ্তও হয়েছে। আন্দামানের যে যে অঞ্চলে পূর্ববঙ্গের যে যে জেলার মানুষ বেশি সেই সব অঞ্চলে সেই সেই জেলার লোকসংস্কৃতির প্রাধান্য দেখতে পাওয়া যায়। এই কারণে আন্দামানের বিভিন্ন প্রান্তে মিশ্র-বাঙালি সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠের সংস্কৃতিই প্রাধান্য লাভ করেছে এবং অন্যদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। লোকসংস্কৃতির উপাদানগুলির মধ্যে বেশকিছু মিল ও সামঞ্জস্য থাকায় অনেকক্ষেত্রেই কোন পার্থক্য নজরে আসে না। আন্দামানে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালিদের প্রথম প্রজন্মের মধ্যে লোকসংস্কৃতির উপাদান যেটুকু বা অবশিষ্ট ছিল প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচার জন্য লড়াই করতে গিয়ে তার অনেকটাই তাঁদের পরিহার করতে হয়েছে। নূতন পরিবেশে ও পরিস্হিতিতে বহুক্ষেত্রেই লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে ফেলায় এঁদের জীবনযাত্রায় লোকসংস্কৃতির ভূমিকা কিছুটা খর্বিত হয়ে পড়েছে। দ্বীপপুঞ্জের কোন কোন অঞ্চলের বাঙালি সংস্কৃতির সংরক্ষণে যথেষ্ট যত্নবান না হওয়ার কারণে অপর গোষ্ঠীর সংস্কৃতির দ্বারা সামান্য হলেও প্রভাবিত হয়েছেন। ফলে দ্বীপপুঞ্জের কিছু কিছু জায়গায় অন্যান্য জাতির সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির সংস্কৃতি সংমিশ্রিত হয়েছে। তথাপি লোকসংস্কৃতির বেশ কিছু উপাদান আন্দামানের বঙ্গজীবনে উল্লেখযোগ্যভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। পৃথিবীতে বেশিরভাগ উদ্বাস্তু সমাজই নূতন জায়গায় গিয়ে তাঁদের ঐতিহ্য বা চিরাচরিত সংস্কৃতিকে অপরিবর্তিতরূপে ধরে রাখতে পারে নি। নূতন দেশে নূতন পরিস্হিতিতে ও পরিবেশে তাঁদের সংস্কৃতি অবধারিতভাবে সংমিশ্রিত হয়ে গেছে। আন্দামানে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রেও তা’ ঘটেছে। এসব সত্ত্বেও লোকসংস্কৃতির কোন কোন উপাদান আন্দামানী বাঙালিদের জীবনযাত্রায় এখনও সংরক্ষিত হচ্ছে। এর মধ্যে বাককেন্দ্রিক, অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক, আচার-ব্যবহারকেন্দ্রিক, ক্রীড়াকেন্দ্রিক ও বস্তুকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির উপাদান উল্লেখযোগ্য।

বাককেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতির উপাদানরূপে আন্দামানের লোকসমাজে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের ধাঁধা, প্রবাদ, প্রবচন, কয়েকপ্রকারের লোকসঙ্গীত, ছড়া ও জনশ্রুতি সংরক্ষিত হচ্ছে। অঙ্গভঙ্গিকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতিরূপে লোকাভিনয় এবং নানাপ্রকারের শারীরিক ভাব-অভিব্যক্তি আগেকার মতই জনসমাজে প্রচলিত আছে। পূজাপার্বণের রীতি-পদ্ধতি, ক্রিয়া-অনুষ্ঠান, লোক-সংস্কার, লোক-উৎসব, লোকাচার, লোক-চিকিৎসা, যাদুবিশ্বাস সংক্রান্ত আচার-বিচার প্রভৃতি আচার-ব্যবহারকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি প্রায় অবিকৃত রূপে অনুসৃত হচ্ছে আন্দামানে। এছাড়া বিভিন্ন লোকক্রীড়া তো আছেই। লোকসংস্কৃতির বস্তুকেন্দ্রিক উপাদানরূপে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হচ্ছে দা, কুড়ুল, শাবল, কাস্তে, লাঙল,হাতুড়ি, হাতা, খুন্তি, বঁটি, কুমোরের চাক, গৃহস্হালি তৈজসপত্র আরও কত কি।

আন্দামানের গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত ধাঁধার প্রধান বিশেষত্ব হল ধাঁধায় গ্রাম্য অশ্লীলতা আছে তা’ যথাসাধ্য পরিহার করে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হল

১) মাথায় আগুন চোখে জল                     ২) ওপর থেকে পড়ল বুড়ি

 বয়স বাড়লে হয় সে ছোট। (মোমবাতি )        রক্তে ছড়াছড়ি। (জাম )

৩) চামড়ার বন্দুক হাওয়ার গুলি                      ৪) আছে ফল গাছে নেই

 মারলাম ফাঁকে লাগল নাকি ? (বাতকর্ম )        খাই ফল তার ছোলা নেই (কালবৈশাখীর শিল)

৫) এক ভাই বরে, এক চরে                     ৬) স্ত্রীলোক রক্ষা পায় দেখাইলে ঊরু

 আর এক ভাই গাছের মাথায়।                    ঊরু যদি দেখায়- লজ্জার কারণ।

 তিন ভাই মিলে গেলে                           ইনস্তকার বদমাস এ বড় ভণ্ড

 লাল টকটক করে। (পান-সুপারি-চুন )          ছাড়াইতে লাগে দ্বাদশ দণ্ড।( চোরকাঁটা )

আন্দামানের কৃষিজীবী বাঙালি সমাজে (মূলতঃ খুলনা ও বরিশাল থেকে আগত মানুষের ) মুখে মুখে প্রচলিত আছে বেশ কিছু প্রবাদ। তার কয়েকটি উদাহরণ রূপে তুলে ধরা হল --

১) খুদ খাইতে বাওন চোহে দেখে না। (২) যে আশায় ঘোরো ফেরো - মাইয়ার গায়ে জ্বর।

৩) জোটে না আদার কড়ি, খাইতে চায় লক্ষ্মী বিলাসের বড়ি। (৪) বেড়া নাই তায় দুয়ার দেয়।

৫) মোটে মায়ে রান্ধে না, তপ্ত আর পান্ত। (৬) না পেয়ে ঘটি গাঙেরে দিলাম।

৭) ঘুঘুতে কয় নানান কথা। (৮) গায়ে নাই ছাল চামড়া, খাইতে চাও পাকা আমড়া।

লোকসমাজে প্রচলিত প্রবচনগুলি চিরাচরিত। তবু তার মধ্যে(১) ঘরের তলে চলবা, (২) মাঝপথে জল খাবা,(৪) মধ্যিখানে শোবা বাবা, তেল মাখবা থাবা থাবা, নিত্যি গ্রাসে মুড়ো খাবা ইত্যাদি উপদেশমূলক প্রবচন বেশ জনপ্রিয়। সাবেক খুলনা জেলার রামপাল অঞ্চল থেকে উত্তর আন্দামানের ডিগলিপুরে এসে পুনর্বাসন পেয়ে বসবাস করতেন প্রয়াত ৺শরৎ হালদার। তিনি ছিলেন একাধারে প্রাথমিক শিক্ষক ও সফল কৃষক। তাঁর বিশাল কলাবাগান ছিল। তিনি মাঝে মধ্যে এই খনার বচনটি আওড়াতেন -----

                                      ডেকে বলে চাষা ভাই

                                      আট হাত অন্তর এক হাত খাই

                                      তিনশো ষাট ঝাড় কলা রুয়ে

                                      থাক গে চাষা ঘরে শুয়ে।

                                      রু’বি কলা না কাটবি পাত ?

                                      তাইতে কাপড়, তাইতে ভাত।

                                      ফাল্গুনে এঠে রোবে কেটে

                                      বেঁধে যাবে ঝাড় কে ঝাড়

                                      কলা বইতে ভাঙবে ঘাড়।

বলা বাহুল্য, এই বচনটি আন্দামানে চাষবাসের জমি পাওয়ার পর শরৎবাবুকে অনুপ্রাণিত করেছিল ও উৎসাহ যুগিয়েছিল। এ বচনটি এখনও প্রচলিত আছে।

আন্দামানে লোকসঙ্গীত ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়ে থাকে। ১৯৪৯ - ’৫০ সালে, একেবারে প্রথমদিকে, আন্দামানে আগমনের প্রাক্কালে জাহাজে ওঠার আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিভাগের পক্ষ থেকে কয়েকটি করে পরিবার নিয়ে গঠিত ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলিকে কীর্তন এবং লোকসঙ্গীত চর্চার জন্য খোল, করতাল, খঞ্জনি ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র দেওয়া হত। জনবিরল অরণ্যসঙ্কুল দ্বীপে বিচ্ছিন্ন জীবনযাত্রায় মানসিক বলবৃদ্ধি ও অবসাদ দূর করার ক্ষেত্রে এইসব উপকরণ খুব কাজে লাগত। আন্দামানে ঐ সময়ে এবং তার পরে আগত উদ্বাস্তুদের মধ্যে বহু সঙ্গীতপ্রেমিক মানুষ ছিলেন। লোকসঙ্গীতের আসর প্রায়ই বসত। ভারত সরকার তথা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুনর্বাসন বিভাগের কিছু আধিকারিক ও কর্মী সেসময় নবগঠিত বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে লোকসংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দান করতেন। পরবর্তীকালে নেহরু যুবকেন্দ্র থেকেও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র এবং যাত্রার পোষাক বিতরিত হয়েছিল। লোকসঙ্গীত চর্চার ধারাটিকে অবশ্য এখনও কিছু মানুষ ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন ধরণের লোকসঙ্গীতের মধ্যে বাস্তুপূজার গান, ত্রিনাথের গান, রয়ানি গান (মনসার গান), দেহতত্ত্বমূলক লোকগীতি, ভাটিয়ালি গান, বাউল গান, বিভিন্ন দেবদেবীর অষ্টক গান, বালাকি গান, বিজয়ের (লোককবি বিজয় সরকারের ) দোঁহা, শীতলা পূজার গান, হরিসঙ্গীত( লোকগুরু হরিচাঁদ ঠাকুর বিষয়ক গান ), স্বরচিত লোকগীতি ইত্যাদি আন্দামানের বিভিন্ন দ্বীপে বসবাসকারী বাঙালিরা এখনও গেয়ে থাকেন। এঁরা মূলতঃ পূর্ববঙ্গের দক্ষিণের জেলাগুলি থেকে এসেছেন। গাজির গান আগে কয়েকজন গাইতে পারতেন, এখন আর এ’ গান গাওয়ার মত কেউ জীবিত নেই। অষ্টক গান বা রয়ানি ঠিকঠাক গাওয়ার মত মানুষও এখন মুষ্ঠিমেয়। বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশই লোকসঙ্গীত চর্চায় আগের মত আগ্রহ দেখান না। তবে গ্রামে-গঞ্জে বিভিন্ন রকমের লোকগীতির সিডি ও ডিভিডি’র চাহিদা এখনও কিছুটা আছে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে চোরাপথে নিয়ে আসা লোকগীতির ডিভিডি-সিডি’র চাহিদাও আছে।

আন্দামানে প্রচলিত বিভিন্ন ধরণের লোকগীতির কিছু নমুনা দেওয়া হল

১) বাস্তু পূজার গান -

                                                 ও গিরি, ও গিরি

                                                            বার করে দাও সোনার পিঁড়ি।

                                                            বাস্তু ঠাকুর এসেছে।

                                                            বাস্তু ঠাকুর দিলেন বর

                                                           ধানে চালে গোলা ভর।

                                                            কলাবাগানে এল পানি

                                                গোলা লয়ে টানাটানি।

                                                            ও মেয়ে, কৈ গেলি ?

                                                 কুলার পিঠা কি করলি ?

                                                            কুলার পিঠা কুলায় খাইছে,

                                                            টেপোলারে বাঘে খাইছে,

                                                 খায় আর কড়মড়ায়

                                                            দু’টো ঘুঘু ফড়ফড়ায়।....

মকর সংক্রান্তির আগে একমাস ধরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঐতিহ্য মেনে এই গান গেয়ে প্রতিটি গ্রামে বাড়িবাড়ি ঘুরে কিশোরের দল টাকা-পয়সা-আনাজ সংগ্রহ করে। মকর সংক্রান্তির দিন বাস্তুপূজা হয়ে থাকে। নিম্নবঙ্গের সুন্দরবন ও সন্নিহিত বাদা অঞ্চলে বাঘ-কুমিরের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কৃষক সম্প্রদায়ের মানুষ বাস্তুপূজা করতেন। আন্দামানে বাঘ না থাকলেও কুমিরের ভয় আছে। বাস্তুপূজার ঐতিহ্য এইভাবে রক্ষিত হচ্ছে।

২) ত্রিনাথের গান-- মূলতঃ বরিশাল জেলায়’ ত্রিনাথের গান প্রচলিত থাকলেও খুলনা জেলাতেও এ গান গাওয়া হয়ে থাকে। আন্দামানে সর্বত্র ত্রিনাথের গান গাওয়া হয়। ব্রহ্মা,বিষ্ণু, মহেশ্বরের উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন উপলক্ষ্যে এ গান নিবেদিত হয়। পালাক্রমে সম্পন্ন গৃহস্হের বাড়িতে ত্রিনাথের উদ্দেশ্যে মানসিকের পূজা আয়োজিত হয়।

                        সারাদিন গেলে ত্রিনাথের নাম লইও রে সাধুভাই,

                        সারাদিন গেলে ত্রিনাথের নাম লইও।

                        আমার ঠাকুর ত্রিনাথ গোঁসাই যার বাড়ি যায়,

                        ওরে, অভাব না আসে তার, সুখে কাল কাটায়।.. ...

৩) বালাকির গান --চড়ক পূজা উপলক্ষ্যে সাবেক খুলনা জেলায়, যশোহরের নিম্নাঞ্চলে এবং নোয়াখালি অঞ্চলে একদা দেউলপাটের সামনে নূপুর পায়ে শিবভক্তরা নেচে নেচে বালাকির পাঁচালি বা বালার গান গাইতেন। এ গানে শিবের বিয়া, গৌরীর শঙ্খভরনী, ধরা সতী, লোহার জন্ম, ত্রিশূলের জন্ম, ব্রহ্মার উৎপত্তি ইত্যাদি পর্ব গাওয়া হয়। নোয়াখালি থেকে আগত উত্তর আন্দামানের গান্ধীনগর নিবাসী কিছু মানুষ এখন এই গান গাইতে জানেন। এ গানের পারদর্শী শিল্পী উত্তর আন্দামানের ডিগলিপুর নিবাসী প্রয়াত রাধাকান্ত বাউলির কাছ থেকে পাওয়া সৃষ্টিতত্ত্বমূলক একটি বালাকির গান এইরকম--

                                    প্রভু হে, নাচল জল নাচল স্হল,

                                    নাচল পবন হুতাশন,

                                    ডেম্বুর বেচলেন প্রভু বালির প্রমাণ।

                                    বটমাত্র ভেসে বেড়ায় হয়ে আকার কম্মুঠ

                                    কঠোর পৃষ্ঠে ধরেছে ফণা

                                    যাহার উপর রাখিল মেদিনী

                                    মেদিনীতে ভর রেখে জিব করিল থির....

৪) শীতলার গান-- উত্তর আন্দামানের কালিঘাট, স্বরাজগ্রাম, রাধানগর ; মধ্য আন্দামানের রঙ্গত, মিথিলা, কদমতলা ; দক্ষিণ আন্দামানের ছোলদারি, লালপাহাড়, ওয়াণ্ডুর, গুপ্তাপাড়া, মানপুর প্রভৃতি অঞ্চলে শীতলা পূজা উপলক্ষ্যে এই গান গাওয়া হয়ে থাকে।

                                     এপার থেকে শীতলা মা পার করে নাও মোরে,

                                     পার হয়ে যাব আমি কৈলাশ লোকের বাড়িতে

                                     সোনার দিবা দাঁড় বৈঠা রূপার দিবা গুড়াবে,

                                     ওপার থেকে শীতলা মা ডাকে পার করে নাও আমারে।....                           

পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালিরা তাঁদের লোকাভিনয়ের ঐতিহ্যকেও ধরে রেখেছেন। দ্বীপপুঞ্জে আগমনের প্রথম পর্বে বিভিন্ন অঞ্চলে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালিরা দেশীয় রীতিতে আগের মতই গীতিমুখ্য লোকনাট্যচর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। প্রথমদিকে উত্তর আন্দামানের ডিগলিপুর অঞ্চলে রামযাত্রা এবং কৃষ্ণযাত্রা অভিনীত হত। পরবর্তীকালে সাগরভাসা, ময়নামতী, আলোমতী, মধুমালা, রূপবান কন্যা, গুণাইবিবি, সোনাইদিঘী, বঙ্গবীর প্রভৃতি গীতিপ্রধান পালা গ্রামীন সমাজে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে দিনকাল পরিবর্তিত হওয়ায় এ ধরণের পালা এখন খুব কমই অভিনীত হয়। আধুনিক যাত্রাপালাগুলি অবশ্য এখনও মানুষের চাহিদা মেনে সঙ্গীতপ্রধান এবং এসব পালার সংলাপ ও সঙ্গীতে লোকনাট্যের প্রভাব সুস্পষ্ট।

আন্দামানের অন্যতম প্রধান লোক-উৎসব মনসাপূজা। সাবেক বরিশাল ও ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষরাই এই পূজার আয়োজন করে থাকেন। শ্রাবণ মাসের শেষদিনে এই পুজো হয়ে থাকে। লোকগুরু হরিচাঁদ ঠাকুরের বারুণী হল আন্দামানের অপর লোক-উৎসব। পূর্বতন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ ও পালং অঞ্চল, বরিশাল জেলার ভোলা, মির্জাখালু, ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ, খুলনা জেলার বাগেরহাট প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আগত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ স্বভুমির মত এখানেও বিভিন্ন দ্বীপে ফাল্গুন-চৈত্রমাসে আরাধ্য হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে মহাসমারোহে বারুণী পালন করেন। জ্যৈষ্ঠমাসের শুক্ল দশমীর দিন আন্দামানবাসী মৎস্যজীবী ও নৌজীবী বাঙালিরা গঙ্গাপূজা করে থাকেন। দোলযাত্রার আগের দিন ঐতিহ্য মেনে প্রায় সমস্ত গ্রামেই শুকনো কাঠকুটো, খড়,পাতা দিয়ে তৈরী বুড়ির ঘর পোড়ানোর সময় অগ্নিদেবতার উদ্দেশ্যে আহূতিরূপে পাঁচ রকমের সবজি নিবেদন করা হয়। ঢোল,করতাল,কাঁসর বাজিয়ে বুড়ির ঘর প্রদক্ষিণ করার পর তাতে অগ্নিসংযোগ করা হয়ে থাকে। আগুন নিভে যাবার পর পোড়া খুঁটিগুলি সংগ্রহ করে সযত্নে রেখে দেন অনেকে। তাঁদের বিশ্বাস, এই খুঁটি ঘরে থাকলে অগ্নিদেব ও ঝড়ের দেবতা পবন দেব তাঁদের ঘরকে আগুন ও ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাবেন।

লোক-চিকিৎসা এবং দৈব-চিকিৎসার উপর এখনও দ্বীপবাসী বাঙালিদের আস্হা গভীর। তাই লোক-চিকিৎসকদের পসার এখানে বেশ ভাল। আঞ্চলিক লোক-ভাষা, লোক-সংস্কার, লোকাচার, ক্রিয়া অনুষ্ঠান, যাদু বিশ্বাস সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠান এখানে এখনও প্রচলিত আছে। বিভিন্ন ধরণের লোক-ক্রীড়াও পরম্পরাসূত্রে চর্চিত হয়ে চলেছে আন্দামানে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এবং অন্যান্য ভাষাভাষী ও সংস্কৃতির মানুষদের সঙ্গে অর্থাৎ তামিল,তেলুগু,মালয়ালি,মুণ্ডা, নিকোবরীদের সঙ্গে সহাবস্হান করেও এখানকার বাঙালিরা আপন সংস্কৃতিকে এখনও সযত্নে রক্ষা করে চলেছে। সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ যে একেবারেই হয় নি বা খুব কম হয়েছে তা’ কিন্তু নয়। আসলে বাঙালি তার নিজস্ব স্মৃতির উপাদানকে রক্ষা করেও অন্যের সংস্কৃতিকে যে অক্লেশে ধারণ করতে পারে সেটাই দারুণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

তবুও দেশভাগের বেদনা কি সহজে ঝেড়ে ফেলা যায় ? নতুন দেশে এসে সুখসমৃদ্ধিময় জীবন লাভ করলেও ফেলে আসা জন্মভূমির জন্য সত্তরোর্ধ প্রায় প্র্ত্যেকেই কষ্ট অনুভব করেন অন্তরে। মন বসানো কি এত সহজ ? -সেই দুঃখই বছর ২০ আগে ঝরে পড়েছিল মধ্য আন্দামানের প্রয়াত লোকসঙ্গীত শিল্পী নিরোদবিহারী সমাদ্দারের একটি স্বরচিত গানে --

             “ কালাপানি তোর কি খেলা, আমি কোথায় ছিলাম কোথায় এলাম

                        কি বুঝব তোর লীলা রে

                        কালাপানি দ্বীপান্তর, শুনে করেছি অনাদর

                        বসে বসে সে’ কথাটি ভাবি রে

                        এখন এই মাটিতে লেগে গেল জীবনভাঁটার দোলা রে।

                        আসছে কত আসবে কত, জীবনমরণ শতশত

                        তাহার কোন ঠিক ঠিকানা নাই রে .

                        এই দ্বীপান্তরের কালো জলে ভাসিয়ে কত ভেলা রে।

                        লিখল নীরদ ভাবের বশে ডুবল বেলা দিনের শেষে

                        ও তার চোখের জলে বুক যায় ভেসে, দীনবন্ধু কোথায় রে।”

দেশ ছেড়ে আসার যন্ত্রণা পলে পলে কুরে কুরে খায় বহ দ্বীপবাসীকে। এঁরা অবশ্য সেই একেবারে প্রথম দিকে দেশভাগের অব্যবহিত পরে চলে আসা মানুষ। এঁরা এখন অশিতিপর। ছেলেপুলে নাতি নাতনিরা সব দ্বীপভূমিতে জন্ম নিয়েছে। তাদের মাতৃভূমি এখন এইটাই। কিন্তু ওই বয়স্কমানুষগুলি এখনও দেশের নামে পাগল। এইরকমই দু’টি মানুষ বিশিষ্ট চরিত্র হয়ে উঠেছেন মধ্য্য আন্দামানের লেখক প্রমথনাথ বারুইয়ের লেখা ‘ ফেরা’ গল্পে। প্র্ধান চরিত্র অনাথের সংলাপ দিয়ে গল্পের সূচনা হয়--“ দ্যাশে মুই যামুই যামু মাস্টেরদা, মুই এহানে মরলে শান্তি পামু না।” দেশছাড়া মানুষদু’টির প্রাণ দেশে ফেরার জন্য নিত্য আকুলিবিকুলি করে ওঠে। দেশের গল্প, দাঙ্গার গল্প বলা অথবা শুধুই স্মৃতিচারণা বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের নিত্য কর্ম। অথচ তৃতীয় প্রজন্ম বেশ সুখেই আছে। তাদের এসব চিন্তাভাবনা নেই। একচল্লিশ হাজার বাঙালি বাড়তে বাড়তে এখন প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি। তারা প্রচলিত হিন্দি ভাষাকে প্রায় মাতৃভাষা করে নিয়েছে। বিবাহাদিও কোথাও কোথাও আর বাঙালির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাংস্কৃতিক সংমিশ্র্ণ হচ্ছে সমাজে। রুটি রোজগারের তাগিদে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বহু নিরুপায় মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে আন্দামানে। পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালিদের মত অঢেল সরকারী অনুদান না পেয়েও তারা বাঁচার চেষ্টায় মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে। ভাব বিনিময় কিংবা সাংস্কৃতিক আদান প্রদানে বাধা নেই তো কোথাও। তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েও ছেলেমেয়ে ঘরসংসার নিয়ে তারা চেষ্টা করছে সহাবস্হান করার। এদের সঙ্গে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত বাঙালিদের দূরত্ব ক্রমশঃ কমছে। আজকের আন্দামানে বাঙালি সমাজ সামগ্রিক ভাবে একটা নতুন রূপ পেতে চলেছে।