পাঠোন্মোচন

গল্পসমগ্র ১ - দীলতাজ রহমান

মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী



বইটির উৎসর্গপত্রে লেখা "জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রীর শেখ হাসিনার করকমলে" । বিগত বছরগুলোতে কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত মোট সাতটি গল্পগ্রন্থকে একত্র করে প্রকাশ করা হয়েছে 'গল্পসমগ্র ১' নাম দিয়ে । দীলতাজ রহমান কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও পাঠকমহলে তাঁর গল্পসমূহই অধিকতর সমাদৃত। গল্প নির্মাণে যে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার পরিচয় তিনি দিয়েছেন, প্রতিটি গল্পের সাথে জীবনের যে ঘনিষ্ঠতা তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তাতে শুধুমাত্র মুগ্ধতাই নয় পাঠকের মনে গভীর এক বোধেরও আলোড়ন তুলতে সিদ্ধহস্ত তিনি । একদিকে ভাবপ্রজ্ঞার দীপ্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, অন্যদিকে অনন্য কুশলী বয়নে রচিত দীলতাজ রহমানের সাতটি বইয়ের সবগুলি গল্প একত্রে হাতে পেয়ে তাঁর পাঠকের খুশিই হওয়ার কথা।
গল্পসমগ্র পড়তে গিয়ে দেখা যাবে অধিকাংশ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রটি নারী । ভূমিকাপত্রে তিনি লিখেছেন "শুধু কল্পনা থেকে এমন চরিত্র চিত্রণ করা হয়েছে , তেমনটি নয় । লেখক নিজে নারী, আর নারীমহলেই তার একচ্ছত্র প্রোপাগান্ডা, সেরকমও কিন্তু নয় । বরং বেশিরভাগ সময়ে চলমান ঘটনা থেকে উপলভ্য অভিজ্ঞতা-নিকষিত দৃষ্টিতে দেখা, নারীর উপলব্ধি ক্ষমতা, ক্ষমা করার মহত্ব, অপরিসীম ধৈর্য আর মমত্ববোধে তাকে পুরুষের চেয়ে মনোবলে কখনো শ্রেষ্ঠ মনে হওয়াতেই বেশিরভাগ গল্প সেভাবে তৈরি " সত্যিকার অর্থে গল্পগুলো যেন সময়ের এক পরিক্রমা, সমকাল এবং সমকালের কিছু পূর্বের অর্থাৎ লেখকের জবানিতে 'একটু পিছানো সময়ের ' । গল্পের রেবতী, নূপুর, হুরমত মোল্লা, শাহানা, ময়েজউদ্দিন, হাসনাহেনা, রোহিনী, তসিরন, কবিরুল, রেহানা, জরিনা এরা সবাই আমাদের নিকটজনদের তুলনায় একটু সুদূর মনে হলেও এদের অস্তিত্বের উত্তাপ আমাদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছোয় । চরিত্রগুলোকে অনুভব করা যায় লেখকের ডিটেইলে ।
বইয়ের ফ্ল্যাপের শুরুতে তিনি এক জায়গায় লিখেছেন- " মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত গল্পগুলো নতুন প্রজন্মকে চিনিয়ে দেবে তার পূর্বসুরির রক্ত ও চেতনার তেজ। যেকোনো ঘটনা অথবা আবহ, অথবা বাস্তবতা বিবর্জিত কোনো বিষয়ও যখন লেখকমনে গল্প হয়ে উঠতে চায়, স্বয়ং বিধাতা তাতে প্রাণ না দিলে গল্পটি গল্পটি প্রাণবন্ত হবে না! অতএব লেখক তখন হয়ে ওঠেন ঈশ্বরের অংশ। "
দীলতাজ রহমানের গদ্য এমনই একটানে পড়ে ফেলা যায় যে এই সাতটি গল্পের বইয়ের মোট ছয়শো চল্লিশ পৃষ্ঠা যথারীতি ঝড়ে উড়ে যাওয়া বইয়ের পাতার মত শেষ হয়ে যেতে বাধ্য। লেখার ভালো-মন্দের প্রশ্ন সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র এই অসম্ভব টানটান গল্পগুলো বলার জন্য তাঁকে বাহবা দিতেই হবে। যেকোনও মুহূর্ত থেকে তিনি তাঁর গল্পের প্রারম্ভিক ধাক্কা অর্জন করে নিতে পারেন, অসামান্য স্বাদু, তরতরে গদ্যে এবং চরিত্র বা ঘটনার সাবলীল সব বাঁকফেরতায় পাঠকের কৌতুহল জিইয়ে রাখতে পারেন এবং ঠিক ঠিক জায়গায় চমৎকার পরিসমাপ্তি টানতে পারেন। কাহিনিকথনের প্রাথমিক শর্তগুলি মেনে, নিজের লেখায় তিনি তৈরি করে ফেলেন অনেকগুলো বোধগম্যতার স্তর, যাতে প্রত্যেকেই নিজের নিজের মতো করে লেখাটিতে অবগাহন করতে পারেন।
দুরন্ত জীবন আসক্তি আকীর্ণ এই গ্রন্থের প্রতিটি গল্পই কোনো না কোনো ভাবে মানুষের নিরন্তর আলোকাভিসারী যাত্রাপথের উপলবন্ধুর কথা বলে। হারিয়ে ফেলা মুখের মায়া যেমন বাস্তব, অনুপম ভালোবাসায় অমর যুবা-বৃদ্ধর ঘাসফড়িং জন্ম যেমন সত্যি, তেমনই প্রকট নিত্যদিনের সাংসারিক চাহিদার নিগড়, অবসাদ, অসুখ বিসুখের অসহায়ত্ব। দীলতাজ রহমানের গদ্য পাঠককেও এমনিভাবেই সঙ্গী করে নেয় গল্প বলার ছলে।


প্রকাশ     : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫
প্রকাশক  : মোস্তফা সেলিম, উৎস প্রকাশন, ১২৭ আজিজ সুপার মার্কেট ( ৩ য় তলা) , শাহবাগ, ঢাকা।
প্রচ্ছদ     : তুহিন হাসান
মূল্য       : ১০০০ টাকা