কাব্যপাঠ

কবি সরকার মাহবুব : মোহন বাঁশির শান্ত রাখাল

ড. জাহিদা মেহেরুননেসা


কবি সরকার মাহবুব, পরিমিতিবোধ যাঁর বৈশিষ্ট্য। সুবক্তা এবং ভাব ভাবনায় একজন অসাধারণ সদালাপী হিসেবে তিনি অনেকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন । তাঁর কবিভাষায় জটিল এবং দুরূহ শব্দ এবং বিষয়ের প্রপঞ্চ নেই । যা আছে তা সহজ বিষয়ের সরল প্রকাশ । একটা নিটোল নিরীহ সারল্য থেকে তাঁর কবিতা লেখা ।
 সত্তরের দশক থেকেই তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেছেন বলে জানা যায়। আশির দশকে  সরকারি চাকরিতে প্রকৌশলী হিসেবে জয়েন করেন।এর বাইশ বছর পরে  প্রশাসনে জয়েন করে অবসর প্রস্তুতিকালে যুগ্মসচিব হিসেবে অবসরে গেলেন।
 ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জেনেছি তিনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশ গ্রহণ করেছেন ।
 এর মধ্যে তাঁর অনেকগুলো বইয়ের  পরিচয় পাওয়া গেছে।  সবুজ সীমানা ঘিরে , কাব্যে কলমে ইন্দোনেশিয়া, বসে আছি নীরব নোঙর, আজন্ম জন্মগ্রাম, নির্বাচিত প্রেমের কবিতা,
কবিতা সমগ্র,
শব্দের অসীম সীমায়
 আবির ছড়িয়ে দেবো ।
আমার হাতে সরকার মাহবুবের দুখানি কাব্যগ্রন্থ আছে। একটি 'শব্দের অসীম সীমায়' আর একটি হল 'আবির ছড়িয়ে দেবো'। মানুষজন প্রকাশনা থেকে গত বছর জুলাই মাসে এ  দুটো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ।কাব্যগ্রন্থ দু'খানি প্রকাশের সাথে সাথে কবি নিজ হাতে আমাকে  উপহার দিয়েছেন। ইতোপূর্বেই তাঁর কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি থাকাকালীন অবস্থায়ই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
 এর মধ্যে শব্দের অসীম সীমায় কাব্যগ্রন্থখানি আমার গভীর মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে ।এই নামটি একটি অদ্ভুত রকমের অসীমতার প্রতি আকর্ষণ করে। একদিকে শব্দ অসীম আবার একদিকে শব্দকে সীমায়িত করার প্রচেষ্টা; এ যেন বস্তুর কেন্দ্রাতিগ এবং কেন্দ্রবিমুখী বল এদুটোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।  দুটো বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে কবি মূলত কী বলতে চেয়েছেন তা দেখার চেষ্টা করে এই লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করছি।
শব্দের অসীম সীমা'র মধ্যে হারিয়ে যাবার আগেই সাংস্কৃতিকও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ( হুমায়ুন আহমেদের বিখ্যাত নাটক কোথাও কেউ নেই এর বাকের ভাই) যিনি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন সেই প্রিয় আসাদুজ্জামান নূরকে  উৎসর্গ করা কবিতাটি দেখতে পেলাম। এর দুটি লাইন : "যার একটু পরশে সোনা হয়ে যায় উত্তরের বিষণ্ন ধূলিকণা।"
যে কোনো মহৎ সাহিত্যই সময়ের অনুপুঙ্খ চিত্র। কবিতা মূলত সৃষ্টি হয় সেই সময়ের বেদনা উত্থিত একধরনের ব্যাধি থেকে । সেই ব্যাধির যন্ত্রণা থেকে সৃষ্ট যুগের সবচেয়ে ঋজু সবচেয়ে ধারালো হীরের দ্যুতি সম্পন্ন বিচ্ছুরণই হলো সার্থক কবিতা ।
'শব্দের অসীম সীমায়' কাব্যগ্রন্থে অনুসন্ধান করবো সেরকম একটি দুটি কবিতা যা কালের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে ।
শব্দের অসীম সীমায়'  নাম কবিতাটি পড়ে একজন নাবিকের অথবা একজন জাহাজ যাত্রীর অভিজ্ঞতা বা পয়েন্ট অব ভিউ থেকে কবিতাটির বর্ণনা পাওয়া যায় বা চিত্রকল্প সৃষ্টি হয়েছে মনে হয়। নাবিক এবং অনেকগুলি যাত্রীর দায়ভারই হল কবিতার বিষয়বস্তু যেরকম একটি কবিতা আমরা পড়েছিলাম রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?
কবিতার প্রথম নয় লাইনই বা চারটা বাক্যই হল মূল কবিতা। শেষের তিনটি বাক্যে এটি শেষ হয়েছে।
 কবিতার শুরুতে জাহাজের কথা বলা হল যেখানে একটি শব্দের কথা আছে ;
 "হুস হুস করে চলছে এবার- কেবলই সামনে চলা"
কবিতাটির শেষের দিকে দেখা গেল,
 "ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে
 মিলিয়ে যাচ্ছে -
একটি শব্দ- একটি পরিচিত সুর।"
কোন্ শব্দ সে বিষয়ে এখানে  কবি কিছু বলেননি। এ কারণে কবিতাটিকে একটু অসম্পূর্ণ মনে হয়। তবে এ নিয়ে কবিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "কোন সে শব্দের কথা আপনি এখানে উল্লেখ করেননি। "
তিনি বলেছেন," পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম।"
কথাটা আমার ভাল লেগেছে।
 কবিতাটি একটি নিটোল শিল্পকর্ম হয়ে উঠবার মত যথেষ্ট সুন্দর অঙ্গসৌষ্টবের অধিকারী হয়েও এখানে যেন একটু মনোযোগের প্রয়োজন ছিল।
 একধরনের নিরপেক্ষ মন নিয়েই কবিতাগুলো পড়ছি, যা সমালোচনার জন্য নয় কিন্তু একান্তই গভীর মনোযোগের কারণে কিছু বলা।  কবিতাগুলো পড়ে মনে হচ্ছে একটি কথা:
আলোচনার জন্য অনেক বেশি না পড়লে কবিতা সম্বন্ধে কিছু বলা যায় না। যত বেশি জানা যায় অত বেশি সুন্দর করে বলা যায়।
A little learning is a dangerous thing;
 Drink deep,or taste not a Pierian spring: there shallow draughts intoxicate the brain,
 And drinking largely sobers us again.
পড়ার কোনো বিকল্প নেই। জীবনানন্দ দাশ পড়াশোনার ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমি কবিতাগুলি পড়েছি গভীর অনুরাগ নিয়ে ; শুনেছিও গভীর আগ্রহে । কারণ জানি
A perfect judge will read each work of wit
 With the same spirit that its author writ:
 Survey the whole, nor seek slight faults to find
 Where nature moves, and rapture warms the mind.
তবে শুধুমাত্র প্রশংসার জন্য বা সমালোচনা করার জন্য নয় এ লেখা নয় । ভাল লাগার মত বেশ কিছু সরল কবিতা আমাদের মনকে স্পর্শ করেছে ।
 যেমন: আমাকে মন্ত্র দাও, ক্ষেতেই কি পচে যাবে কষ্ট-ফসল, আমার জলে, অপার হিমাদ্রি, ঘড়ির কাঁটার চেয়ে, অতৃপ্ত সাগরে ইত্যাদি । হেটেছি দীর্ঘ পথ নামে শুধু সংখ্যার মাধ্যমে চিহ্নিত সতেরোটি কবিতা আছে যা কবির বিস্তীর্ণ কাজের ক্ষেত্র এবং অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
 তবে 'শব্দের সেন্ট্রিয়ল' কবিতাটি একটি বিশেষ ভাললাগার মত কবিতা। বিজ্ঞানও কল্পনার মিশেলে কবিতা লেখার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। জীববিজ্ঞানে কোষের সেন্ট্রিয়ল বলে একটি বিষয় আছে কিন্ত শব্দের সেন্ট্রিয়ল রূপে শব্দের আন্তরশক্তি আবিষ্কারের চেষ্টা কবির এই কবিতায় পেয়ে ভাল লেগেছে । যা পরে উল্লেখ করছি।
 শব্দের সেন্ট্রিয়ল কবিতায় দেখা যায়-
"শব্দ এমনই কোন দু:খ - যন্ত্রণা কিংবা অস্ফূট প্রেম-
যার লোহিত কণার মধ্যে অন্তত একটি সেন্ট্রিয়ল থাকে
 যাকে ঘিরে শব্দের মায়াময়  অসীম শরীর ।
(শব্দের অসীম সীমায়
 পৃ: 54)
শব্দ যে অসীম সম্ভাবনাময় এই একটি বিষয় এখানে কবির কবিতায়  দেখা যায়। প্রথম কবিতায় (শব্দের অসীম সীমায়) কবি শব্দকে হারিয়ে ফেলছেন আবার শব্দের সেন্ট্রিয়ল কবিতায় শব্দকে অসীম সম্ভাবনাময় মনে করছেন। এই ভাঙাগড়ার দোলাচলে দুলে কবিতাগুলোতে ভাললাগা ছড়িয়ে পড়ে।
'হতে চাই বিমুগ্ধ আত্মহারা' এই কবিতায়-
সীমানা দেয়াল যেন বাঁধে- না কো তিস্তারধারা-
অবাধ জলের প্লাবনে হতে চাই-বিমুগ্ধ আত্মহারা।
(শব্দের অসীম সীমায়
 পৃ : 16)
শেষ লাইন দুটিতে আমাদের প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়।
 পাশাপাশি আর একটি কবিতা
'ক্ষেতেই কি পচে যাবে কষ্ট-ফসল'
কবিতার শেষ লাইনে
"অদ্ভুত রাজনীতির অশান্ত বাতাসে
 এভাবে ক্ষেতেই কি পচে যাবে কষ্ট-ফসল!"
 (শব্দের অসীম সীমায় পৃ- 17;)
 'শেকড়' একটি ভাললাগা চারলাইনের ছোট কবিতা
 এতে আছে
'সকল কষ্ট জানতে হলে
 শেকড় ধরে খুঁজতে হবে।'
 'অপার হিমাদ্রি' একটি চিত্রকল্পময় কবিতা।
 এখানে রাখালের কথা আছে।
"শান্ত রাখাল- বাজিয়ে মোহন বাঁশি
 জাগিয়ে তোলে সে এক অপার হিমাদ্রি।"
পৃ: 24।
 'কুয়াসা এখন' কবিতায় একটা তীব্র স্থবির অসার্থকতার হতাশা আছে । হতাশা আছে সময়ের স্থবিরতার।
" বাগানের সব পাখি ডানাহীন-ওড়াউড়ি ভুলে গেছে
 আদর সোহাগ ভুলে গেছে,
যেন চঞ্চুহীন-নাক-কাটা বাঁদর সবাই
 লম্বা লেজ নিয়ে পাড়ি দেয় বন্ধুর পথ।"
এখানে চিত্রকল্পের মাধ্যমে বিষয়বস্তু সম্বন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা আছে । যা কুয়াসা সম্বন্ধে বোধ সৃষ্টি করে।
 এর পরেই এই কবিতায় -
'এখন কুয়াসা মানে ঘন অন্ধকার-'
আবার পরবর্তী লাইনে-
কুয়াসা মানে উত্তাল সাগরে ঢেউ ভেঙ্গে চলা
 কুয়াসা মানে জীবনের অবিরাম চিৎকার
 কুয়াসা এখন চোখের তারায় বড় বেশি ঘোর।
এর পরেই এই কবিতায় দেখা যায় একুশের আশার আলোর কথা, একাত্তরের কথা-
কবিতার শেষে দেখি আবার একটি সংশয় -
চিত্রকল্পময় বর্ণনার চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও কোথায় যেন ব্যাঞ্জনার ব্যাপারটি আর একটু লাবণ্যময় হয়ে ওঠার ব্যাপার ছিল ।
 যেমন এখানে-
"কুয়াসা এখন হানা দিতে চায়-
স্নিগ্ধ বাগানে- আমাদের শান্তি জঠরে।
 কুরে কুরে খেতে চায় প্রগতির চাষ বাস।"
শেষ দুটি লাইনে-
প্রকৃত-ই কুয়াসা এখন শরৎ- হেমন্ত পেরিয়ে
 গ্রীষ্ম-বর্ষা আর বসন্তে এসে ঠেকেছে।
( কুয়াসা এখন
 শব্দের অসীম সীমায়, পৃ : 10)
'বসন্তে এসে ঠেকেছে' কথাটা যেন কবিতাটির সম্পূর্ণ ব্যঞ্জনাকে কোথায় যেন একটু খাপছাড়া করে দেয় ।
 এই পতাকার ছায়া তলে কবিতায় তিনি দেশের স্বাধীনতার কথা, সার্বভৌমত্বের কথাও সুখ শান্তির প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন।
ওড়ালেন তিনি জাতির পতাকা
 ওড়ালেন প্রত্যয়
 এই পতাকার ছায়াতলে আজ
 মুছে গেছে সংশয় ।
 পৃ:13
কবি সরকার মাহবুবের কবিতায় একটি সহজ সুরও ছন্দের মৃদু স্পন্দন পাওয়া যায় ।যা বোধের ঘোরে খুব একটা ভারাক্রান্ত করে না; কিন্তু কিছুটা সময়  একটি আনন্দের মৃদু অনুরণনের মধ্যে পাঠককে মাতিয়ে রাখতে পারে। তাঁর কিছু কবিতা ভাল কবিতা বলেই হয়তো টিকে যাবে।
 শেলি বলেছেন:
All high poetry is infinite; it is as the first acorn, which contained all oaks potentially. Veil and veil may be undrawn, and the inmost  naked beauty of the meaning never exposed. A great poem is a fountain for ever overflowing with the water of wisdom and delight; and after one person and age has exhausted all its divine effluence which their peculiar relations enable  them to share, another and yet another succeeds and new relations are ever developed, the source of an unforeseen and an unconceived delight."
খুব ভাল কবিতা এক রকম অনির্বচনীয় আনন্দের উৎস হয়ে মনের মধ্য চিরকাল তার অস্তিত্বের অনুরণন রেখে যেতে সক্ষম হয়। সেই রকম কিছু কবিতা সৃষ্টি করতে পারলে কবি সরকার মাহবুব সাহিত্যের জগতে তাঁর নাম চিরস্থায়ী করতে পারবেন। তবে সেজন্য তাঁকে আরও কিছু বিষয়ের প্রতি আত্মনিবেদিত থাকতে হবে তাহল: সময়ের একটি দর্পণ বা আয়না হওয়া একটি জরুরী বিষয়। শাশ্বত সাহিত্য চিরদিন সমাজ জীবনের চিত্র ।
 চর্যাপদে যা আমরা পেয়েছি ।
 সমাজ জীবনের নির্মল অনুপুঙ্খ চিত্র এঁকেছেন সেই যুগের চর্যাকারেরা। কারণ
A poem is like painting : the closer you stand to this one the more it will impress you, whereas you have to stand a good distance from that one;this one demands
 a rather dark corner, but that one needs to be seen in full light , and will stand up to the keen-eyed scrutiny of the art-critic; this one only pleased you the first time you saw it , but that one will go on giving pleasure however often it is looked at"
তবে কবি সরকার মাহবুবের কবিতা গভীরভাবে উপলব্ধি করলে বোঝা যায় তিনি তাঁর আবেগকে সুগ্রন্থিত করার জন্য নানা খণ্ড খণ্ড চিত্রকে একত্রিত করার একটা চেষ্টা করেন কিন্তু এই চিত্রগুলোকে ভাবের ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ করার জন্য আরো বেশি নিবিষ্টভাবে এর চেষ্টা করে যেতে হবে। আধুনিক কবিতা হল দুরূহ শিল্প, নিপুণ সৌন্দর্য অনুধ্যান।
 শেষে বলতে পারি কবি মাহবুবের কবিতায় এক মোহন বাঁশিওয়ালা রাখালকে দেখতে পাই যিনি ভিন্ন রকম এক অনিন্দ্য প্রকৃতির কাছে নিয়ে যান যখন বলেন:
 "আছে পাহাড় - পাহাড়ের চূড়া, বনভূমি
 ঘন চুলের মতই গহীন গভীর।
 উত্তাল সমুদ্র, জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় বেলাভূমি
 শান্ত রাখাল- বাজিয়ে মোহন বাঁশি
 জাগিয়ে তোলে সে এক অপার হিমাদ্রি।"

কবির এমন নিপুণ শিল্পবোধ পাঠককে আপ্লুত করে প্রেমে এবং সৌন্দর্যভাবনায়।