অনুচ্চার কবিতা ভ্রমণ

মৃণাল বসুচৌধুরী

কবি তানিয়া চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থ “কিছু একটার জন্য” হাতে পেয়েছিলাম প্রায় বছরখানেক আগে।বলতে দ্বিধা নেই, এই নামকরণের পেছনে কবির ভাবনচিন্তা যাই হোক না কেন,প্রকাশভঙ্গি আমাকে কৌতুহলী করেছিল। সাধারণভাবে অনেক কবিই হয়ত “একটা কিছুর জন্য” নামটি বেছে নিতেন, কিন্তু তানিয়া “কিছু একটার জন্য” নামটির মধ্যে দিয়েই বোধহয় প্রচলিত ধ্যানধারনাকে একটু সরিয়ে রাখলেন--- সশব্দে নয়, আলগোছে। একসময়, ষাটের দশকে “শ্রুতি” আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকায়, কবিতা সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু ধারণা আছে। আমার সেই বিশ্বাস, সেই উপলব্ধি আমায় কবিতা লেখায়।কিন্তু কোনো গোঁড়ামি নেই। আর পাঠক হিসাবে আমি সমস্ত সময় অপেক্ষা করি সেইসব কবিদের জন্য,যাঁরা আমার বিশ্বাসের দূর্গের মধ্যে একটু তোলপাড়, একটু ভাঙাচোরা করে নিয়ে আসবেন অন্যরকম কবিতা।অদৃশ্য শিকড় ধরে, শব্দ মূর্ছনায় নাড়িয়ে দেবেন আমাদের মেধা ও মনন।কবি তানিয়া চক্রবর্তীকে আমার তেমনই একজন কবি মনে হয়েছে।এ প্রসঙ্গে দু’ একটি কথা উল্লেখ করার প্রয়োজন বইটি যখন হাতে পাই, তখনই জেনেছিলাম তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত  হয়েছিল জুন ২০১১ এ,কবিসম্মেলনে। ঠিক তার দেড় বছর পরেই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ।এর আগে, এমন ঘটনা খুব একটা চোখে পড়েনি আমার।বুঝতে অসুবিধা হয় না, কবিতা প্রকাশ নয়, কবিতার মধ্যে ডুবে থাকাতেই ভালো লাগা তাঁর। কে জানে হয়ত প্রথম কবিতা প্রকাশের অনেক আগে থেকেই এই শব্দশিল্পের সঙ্গে তার গাঁটছড়া!প্রথম কবিতাতেই তার আভাস পাই কিছুটা  “ কিছু দিন স্বার্থ বুঝে নিই /সুসময়ে মোবাইল সুইচ অফ করা/দুঃসময়ে কাতর হয়ে যাওয়া/আর কিছু দিন আমিষ খেয়ে নিই/তারপর সবুজ রং মেখে ঢালাই করব সভ্যতা/একরাতে ঘুম পায়, অন্যরাতে প্রেম /মাঝে যদি কবিতা আসে লেপটে যাই/যাবতীয়কে দূরে ঠেলে পা ধরে অবগাহন শিখি...”(সাপুড়ের ইতিহাস)। একটু অন্যরকম অবগাহন শিখতে শিখতে--- “নদীর দু’ধারে সন্ধি খুঁজতে গিয়ে” তিনি দেখেন “মিথ্যেতে ভরে গ্যাছে বিছানা” আর এক অদ্ভুত বিষণ্নতায় তিনি উপলব্ধি করেন--- “সমগ্ররা এখানে গোল গোল ক্যাকটাস” অবাক বিস্ময়ে দেখেন---“ঋতুহীন গাছের পাশে দাঁড়িয়ে নেই কেউ---” ।এই অবগাহনের সততায় তিনি “ঘাড় ঘোরাতে ঘোরাতে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে অন্তর্বাস” দেখে নেন--- জেনে নেন “প্রজাপতির পূর্বজীবন”।মন্ত্রোচ্চারণের মতো বলে ওঠেন---“ আমার পাশে বসা নকল চাঁদ/তোমার বুকে সুদিন দেখেছিল/ওর বহতা মোহোনায় প্রাপ্তি যোগ করে/মার্জার হতে শিখেছি/খুঁজেছি শিকারীর বিশ্রামের তাঁবু ”---(সুদিন) । কবির অধিকাংশ কবিতায় উচ্চারণ আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। তাঁর আত্মমগ্ন উপলব্ধির জাত একেবারেই স্বতন্ত্র।মানুষের জীবনযাপন,ঈর্ষা, লোভ,দুঃখকষ্ট, শরীরী প্রেম, যৌনতা, বিষাদ ও আনন্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তাঁর কবিতায়।
১। ছাই মেখে নদীর পাড়ে বসে আছে প্রেম/কাদায় ভাসে মুখ, নদীর বাঁকে চাঁদের ছবি/ ঠিক এইখানে এসে প্রেম অবয়বহীন/ফাঁপা চামড়ার ঢাক থেকে শব্দরা কাঁদে... (ধূসর কবিতা)
২। ডেকো না.../ডাকলে কেউ খুশি হয় /কেউ বিড়ম্বিত / আর চাপে পড়ে মাটি হয় ভারসাম্যহীন  (ডেকো না)
৩। এবার প্রেম করো.../ প্রেম তোমায় নুনকাটা রহস্য শেখাবে । (রহস্য)
এ রকম সজীব , উজ্জ্বল পংক্তিমালার মধ্যেই সার্থক হয়ে ওঠে তাঁর কবিসত্তা। কিন্তু কবি তানিয়া কি এমন সহজ সরল আত্মনিষ্ঠ উচ্চারণেই বেঁধে রাখতে চান তাঁর কবিতা? না বোধহয়! কবিতায় , নিজেরই তৈরী মায়াবী আবহ তিনি হঠাৎ ভেঙে দেন কিছু ভারী, বিদেশী শব্দ দিয়ে। বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো প্রসঙ্গ, অনায়াসে চলে আসে তাঁর কবিতায়।কবিতাকে যাঁরা শব্দের শিল্প মনে করেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন, শেষ পর্যন্ত সম্ভবপর মুহুর্তে শব্দের সম্ভাবনা যাচাই করতে হয় কবিকে।সঠিক শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমেই তিনি অর্জন করতে পারেন স্বতন্ত্র ভাষা ও উচ্চারণ ভঙ্গী।সেই অর্থে কবি একজন শব্দ-সাধক। কবি তানিয়া চক্রবর্তী তাঁর কবিতায়  প্রায়শই এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেন যা অনভ্যস্ত পাঠকের কাছে হয়ত সহজবোধ্য নাও হতে পারে কিন্তু সেই সব শব্দ তাঁর প্রকাশভঙ্গিকে দেয় এক সপ্রতিভ তির্যক সংবেদনশীলতা। “অবলিগেটরি” কবিতার প্রথম স্তবকটির দিকে মুখ ফেরাই--- “ধরো, মাংস খেতে ইচ্ছা করছে খুব/  অথচ চারিদিকে শুধু সব্জি/ খিদের আশ্লেষে তোমাকে সবুজই খেতে হবে/ ....দেখবে শৈবাল ব্লুম যৌবন দিচ্ছে” কিংবা “সিদ্ধিলাভ” কবিতাটির শেষ অংশ---“...ঈষদুষ্ণ জলে নুন দিয়ে মরা কোষকে ভালোবাসো/ ভ্যারিয়েশন বুঝে মাধুকরীর জন্য অপেক্ষা করো/ সিদ্ধিলাভ একটা নিছক শব্দের খেলা।’’  আবার “দাগ” কবিতায় তাঁর উচ্চারণ---“কেউ কেউ বলছে তুমি সৎকার ভালোবাসো/আমি অপরাধ---মাঝখানে গেমিউল বেরোয়/নিস্পৃহ তাঁবুতে পড়ে থাকে তির্যক স্পর্শ...” যেমন অনায়াস তিনি তৈরী করেন ব্যক্তিগত স্বপ্নের আবহ, ঠিক তেমন দক্ষতায় সেই সব ভেঙে দেওয়ার মধ্যেই তার আনন্দ।সামাজিক প্রেক্ষাপট , চতুর্দিকের নৈরাশ্য, জটিল বিষাক্ত পরিবেশ এবং কিছু বৈদ্যুতিন অভ্যাসের মধ্যেই জীবনযাপন আমাদের।আমরা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্রক্রিয়ায় আত্মস্থ করি আমাদের অভিজ্ঞতা । কবি তানিয়া চক্রবর্তীর কাব্যচেতনার জন্মওতার পারিপাশ্বিক জগত থেকে উপলব্ধ অভিজ্ঞতার মধ্যে। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার মধ্যে বেড়ে উঠলেও তাঁর কবিতায় এক পরিশুদ্ধ মননের মুখোমুখি হই আমরা--“ভেজা চোখের পাশ দিয়ে/জন্মাচ্ছে পাথরকুচির জননশিল্প/বিছিন্ন পাওয়ায় কালো হয়ে উঠছে ফিলামেন্ট/সমস্ত আলো শোষণ করে নিচ্ছে মীমাংসা/মৃত্যুকালীন বাল্ব কেটে যাচ্ছে/কর্কট এসে কোষ খাচ্ছে”  ---(ফিলামেন্ট)। প্রেমহীন , সিদ্ধান্তবিহীন পরিক্রমায় “কালপুরুষের ফাঁদ” এড়িয়ে “আতিথেয়তার হাড়িকাঠে” মাথা রাখবার আগে নিষ্পাপ তার উচ্চারণ---“পিন্ডের ধারণা করি, এসো / পিন্ডের পূর্বযোনি আমার একমাত্র বাসস্থান”--- (পরিণতি)। সঠিক শব্দ ব্যবহারে  কোথাও কোথাও তাঁর চিত্রভাষায় অনুপম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়েছি ---“চাঁদের গলনকাহিনি বলেনি কেউ/শুধু বলেছে পুরুষটি ময়াল সাপের বংশধর/এক একটা নক্ষত্র চুরি করে সে সাজিয়েছে চোখ/ক্রমশ আলোরা প্রতারক হয়ে গেছে”---(পুরুষটি)। এমন শব্দ নিয়ে আঁকা অনেক ছবি ছড়িয়ে আছে তাঁর কাব্যগ্রন্থে। সহৃদয় পাঠক এইসব শব্দ-ছবি যে নামেই তাদের অভিহিত করুন না কেন ঔজ্জ্বলতা অম্লান থাকবে তানিয়ার কাব্যজীবনে। এই প্রসঙ্গে টি এস ইলিয়টের একটি উক্তির সূত্র মনে পড়ছে ---শুধুমাত্র  সত্যের প্রকাশ নয় , কবির উপলব্ধ সত্যকে বাস্তবের তুলনায় আরো অধিকতর সত্য করে তোলাই কবির কাজ। দৃশ্যমান সত্যকে বোধ বা চৈতন্যর রং,খড়,মাটি দিয়ে আরো বেশি গ্রহণযোগ্য করে তুলবেন কবি, তাঁর সৃষ্টির মাধুর্যে এটাই কাম্য। তানিয়ার কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হল তিনি ঠিক পথেই হাঁটছেন। যে প্রয়োজনীয় কথাটি শুরুতেই বলা উচিত ছিল সেটা বলেই শেষ করবো---আমি নিজে কবিতা লিখি। কারো কবিতার সমালোচনা করার যোগ্যতা আমার নেই। কিছু কিছু সর্বজ্ঞ সমালোচকদের মতো ক্ষুরধার মননশক্তি থাকলে হয়ত তানিয়ার কবিতার কথা বলতে গিয়ে নিজের কথাই বলতাম বেশি। পারিনি। আমার এই অক্ষমতায় আমি লজ্জিত নই । কেননা, আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে নতুন প্রজন্মের একজন কবিকে বোঝার চেষ্টা করেছি মাত্র। কিছুটা পেরেছি, যেটুকু পারিনি সেটুকু আমি আমার কল্পনায় প্রত্যক্ষ করেছি । দেখেছি তাঁর প্রজ্ঞাশাসিত শব্দমিছিলে  কবিতার আলোকিত আনন্দযাত্রা ।অনির্বচনীয় আনন্দে সার্থক হয়েছে আমার “কবিতা-ভ্রমণ”। আনন্দপাঠ।
কাব্যগ্রন্থ   : কিছু একটার জন্য
প্রাপ্তিস্থান : 'পাঠক' , ৩৬ কলেজ রো, কলকাতা-৯