চেঙ্গিস খানঃ সব মানুষের সম্রাট

মূলঃ হ্যারল্ড ল্যাম্ব
অনুবাদঃ যায়নুদ্দিন সানী

হ্যারল্ড ল্যাম্বের অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ বই “চেঙ্গিস খানঃ এম্পেরর অব অল ম্যান” এটি মুলত একটি নন-ফিকশন হিস্টরিক্যাল বায়োগ্রাফি। যেখানে চেঙ্গিস খানের মত একটি ঐতিহাসিক চরিত্রকে এবং তাঁর সময়কে বর্ণনা করা হয়েছে সুনিপুণ দক্ষতার সাথে অবশ্য হ্যারল্ড ল্যাম্বের মত এমন একজন লেখকের কাছে এটা পাঠকের তথা ইতিহাস পিপাসুদের প্রত্যাশিত। এমন একটি বই বাংলায় “চেঙ্গিস খানঃ সব মানুষের সম্রাট” নামে অনুবাদ করেছেন যায়নুদ্দিন সানী এবং প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনী 'দিব্য প্রকাশ'।
মঙ্গোল নেতা চেঙ্গিস খান ইতিহাসে বৃহত্তম সাম্রাজ্যর প্রতিষ্ঠাতা। চেঙ্গিস খান তাঁর দুর্ধর্ষ রণকৌশল আর শাসক হিসেবে জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেকটা জয় করে ফেলেছিলেন আজ থেকে প্রায় সাতশ বছর আগে। মঙ্গোলিয় মালভূমির যাযাবর গোত্র ঐক্যবদ্ধ করার পর মধ্য এশিয়া এবং চীন এর বিশাল অংশ দখল করে নেয় এমনকি তাঁর সাম্রাজ্য আরও প্রসারিত হয়ে পোল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিরিয়া ও কোরিয়া ছাড়িয়ে যায়। তিনি তাঁর প্রজাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সামজিক নিরাপত্তা, ন্যায় বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইয়াসা নামক আইন প্রণয়ন করেছিলেন। নির্যাতন এবং ধ্বংসের কারণ হয়েছিলেন শত্রু  গোত্রের; ধ্বংসযজ্ঞের পরিণাম এত ভয়াবহ হত যে কোন গোত্র বিলুপ্তির জন্য তা যথেষ্ট ছিল, তিনি তাঁর সময়ে লোকেদের বানিজ্যেও উৎসাহিত করেছেন।
বাল্যকালে তেমুজিন; পরে চেঙ্গিস খান। আধুনিক মঙ্গোলিয়া এবং সাইবেরিয়া মধ্যবর্তী এলাকা তথা গোবি মরুভূমি অঞ্চলে এক উপজাতীয় গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন মঙ্গোল গোত্র প্রধান। তার মা তার পিতা দ্বারা অপহৃত হয়েই বিয়ে করতে বাধ্য হয় । সময়টাই ছিল এমন যাযাবর
উপজাতিদের গোত্রে গোত্রে বিবাদ এবং সংঘর্ষ একটি সাধারণ ঘটনা। ক্রমাগত যুদ্ধ এবং একে অপরের থেকে সম্পদ, খাদ্য, গবাদি পশু সহ প্রয়োজনীয় বস্তু  চুরি অথবা লুটপাট করেই নিজেদের তথা গোত্রের সমৃদ্ধি ও বীরত্বকে সমুজ্জ্বল করত। ফলে তেমুজিনের জীবনও হিংস্রতার চর্চার মধ্য দিয়েই শুরু। বিষ প্রয়োগে শত্রু দ্বারা পিতার মৃত্যুর পর দশ বছর বয়সেই তাকে পরিবারের দেখাশোনার ভার নিতে হয়েছিল। চেঙ্গিস খানের শৈশব সম্পর্কে বেশিরভাগ জানা যায় মঙ্গোলিয় ইতিহাস ও সাহিত্য থেকে।
চেঙ্গিস খানের সর্বপ্রাণবাদীতার কারণে তাঁর অনুসারীদের মধে খ্রিস্টান, মুসলমান ও বৌদ্ধ সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অন্তর্ভুক্তি ছিল। তিনি তাঁর সাহস ও যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে সব প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের পরাজিত করেছিলেন এবং শাসক হিসেবে তাঁর অনবদ্য কর্মযজ্ঞ এবং প্রজাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার জন্যই তিনি চেঙ্গিস খান বা সার্বজনীন শাসক বা সব মানুষের সম্রাট নামের অধিকারী হয়েছিলেন। কয়েক শতকের ইতিহাসে চেঙ্গিস খানই সর্বপ্রথম তুর্কি-মঙ্গোল জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সেই জনগোষ্ঠীর চেঙ্গিস খানের প্রতি বিশ্বাসের জায়গা এতটা দৃঢ় হয়েছিল যে তারা চেঙ্গিস খানকে ঈশ্বরের পাঠানো বীর হিসেবে স্বীকার করত এবং তারা বিশ্বাস করত যে তাঁর উপর রয়েছে স্বর্গশক্তি তথা স্বয়ং ঈশ্বরের আশীর্বাদ। চেঙ্গিস খান প্রতিনিয়ত সংঘর্ষে লিপ্ত অবাধ্য জাতিগোষ্ঠীকে এক করার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং পরিকল্পনা মাফিক রহস্যময় উঘুইর, বিশ্বস্ত কারাইত, রুক্ষ ইক্কা মঙ্গোল, ভয়ঙ্কর তাতার, মেরকিট, তুন্দ্রা জনগোষ্ঠী এবং শিকারিদের একীভূত করে বিশাল এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেন, যার নেতা হয়েছিলেন তিনি নিজে।
চেঙ্গিস খান চীনা রাজ্যের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলাকালে মারা যান। রণকৌশলের কারণে তাঁর অনুসারীদের কাছে মৃত্যু সংবাদ গোপন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর মৃত্যুর পরও স্বাভাবিক নিয়মেই যুদ্ধ হয়েছিল। ধারণা করা হয় তাঁর প্রিয় কোন অরণ্যে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে যা আজ অবধি রহস্য; তাই পৃথিবীর কাছে তাঁর  তার চিরনিদ্রার স্থান অজানাই রয়ে গেছে ।
সমগ্র বইটি চারটি পর্বে বিভক্ত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অনুসরণ করে এবং সময় উল্লেখ পূর্বক বইটিতে হ্যারল্ড ল্যাম্ব চেঙ্গিস খানের যুদ্ধ বিগ্রহ, বীরত্ব গাঁথা ও শাসন চিত্রায়ন করেছেন। যা অনুসন্ধিৎসু ও ইতিহাস পিপাসু পাঠককুলের কাছে সমাদৃত হওয়ার প্রধান কারণ। অনুবাদ গ্রন্থটিতে অনুবাদক যায়নুদ্দিন সানী অত্যন্ত দক্ষতা ও যত্নের সাথে শব্দের প্রয়োগ ও বাক্য বিন্যাস করেছেন ফলে সহজ সরল ও প্রাঞ্জল ভাবে একটি ভিনদেশী ভাষার বই বাংলা ভাষার পাঠকদের পিপাসা নিবারনের সহায়ক হবে। তবে বর্ণনায় আরও উৎকর্ষতা প্রত্যাশিত যার মাধ্যমে পাঠকের আগ্রহকে ধরে রাখা সক্ষম। বানান জনিত ত্রুটি নেই বললেই চলে যা প্রশংসনীয়।  প্রচ্ছদ করেছেন স্বনামধন্য প্রচ্ছদশিল্পি ধ্রুব এষ। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খান যেহেতু মূল চরিত্র সেই অর্থে প্রচ্ছদটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক এবং নান্দনিক। সর্বোপরি বইটির বাঁধাই, এবং আকারের ক্ষেত্রে দিব্য প্রকাশ প্রকাশনী যথেষ্ট মনযোগী ছিল।